কন্ঠশিল্পী পাওশির কাব্য কথা

বৈশাখী ইবনাত (পাওশি) ২৬ এপ্রিল (১২ বৈশাখ) ১৯৮৫ সালে রাজশাহী শহরে জন্ম গ্রহণ করেন। মা মমতাজ বেগম ও বাবা মো: নজরুল ইসলাম সরকার এর ঘরে তিনি ছিলেন প্রথম সন্তান। মাত্র ৪ বছর বয়সে তাকে নাচের স্কুলে ভর্তি করা হয়। তখন মা গান শিখতেন নারায়নগঞ্জের প্রখ্যাত ওস্তাদ জনাব আবু তাহেরের নিকট। বাড়ীতে গানের চর্চা তাঁকে ক্রমান্বয়ে উচ্চাঙ্গ সংগীতের প্রতি অনুরাগী করে তুলে। তিনি শিশু একাডেমী  ছবি আঁকা শিখতেন। তিনি খুব ভাল ছবি আঁকতেন বিশেষ। মানুষের মুখের অভিব্যক্তিসহ অবিকল ছবি আঁকতে পারতেন। কিন্তু তার সংগীত সত্তা সর্বদা তাঁকে টানত। সব ছেড়ে তিনি সঙ্গীতে শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন। প্রকৃত অর্থে ছোট বেলাতে তিনি মায়ের নিকট থেকে গানের ওস্তাদ ও হারমোনিয়াম দুটোই তার নিজের দাবী করে নিয়ে নেন। অত:পর নৃত্য, ছবি আঁকা ছেড়ে মায়ের সংগে ওস্তাদ আবু তাহেরের নিকট কন্ঠশীলন করতে থাকেন।শিক্ষা জীবনে তিনি মেধাবী ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে সমাজকল্যাণ বিষয়ে মাষ্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে এমপিএইচ বিষয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।

তিনি ১৯৯৬-৯৭ সালে ওস্তাদ ড: হারুন অর রশীদ এ উচ্চাঙ্গ সংগীতে তালিম নেয়া শুরু করেন। ১৯৯৮ সালের দিকে তিনি ভারত উপমহাদেশের প্রখ্যাত শাস্ত্রীয় সংগীত গুরু জনাব এ দাউদ খানের (কিরানা ঘরানা) শিষ্য ওস্তাদ বাবু অনীল কুমার সাহার নিকট উচ্চাঙ্গ সংগীতে তালিম নিতে থাকেন। এ সময় তাঁর সাথে তবলায় সঙগত করেছেন। ওস্তাদ বাবু মদন গোপাল দাস (একুশে পদক প্রাপ্ত)। উচ্চাঙ্গ সংগীতের পাশাপাশি নজরুল সঙ্গীতের ভক্ত ছিলেন এবং এ বিষয়ে তার প্রচুর আগ্রহ ছিল। তিনি নজরুল একাডেমীতে স্পেশাল ইয়ার পর্যন্ত পড়াশুনা করেছে। তিনি ভারত উপমহাদেশখ্যাত বাংলাদেশের অন্যতম নজরুল সঙ্গীত গুরু এর শিল্পী জনাব খায়রুল আনাম শাকিলের  (একুশে পদক প্রাপ্ত) নিকট ২০০১ সালে হতে আমৃত্যু নজরুল সংগীতে তালিম নিয়েছেন। তিনি নজরুল সঙ্গীত ও সেমি-ক্লাসিক্যাল সংগীতেরএ্যলবামও বের করতে চেয়েছিলেন। তিনি বাংলা ছাড়াও হিন্দী, উর্দু ও ইংরেজী ভাষার গান গাইতে সিদ্ধ হস্ত ছিলেন। হারমোনিয়াম বাজানোতে প্রচুর দক্ষতা ছিল। তিনি খুব সহজেই হারমোনিয়াম যে কোন একবার শুনেই গান তুলে ফেলতে পারতেন। তিনি এরূপ বিরল উদ্ভাবনী ক্ষমতার মানুষ ছিলেন। বিভিন্ন ভাষার ৪০০-এর অধিক গান তার আত্মস্থ ছিল। এ গানগুলো তার হাতে লেখা গানের ডাইরীতে রয়েছে।

পড়াশুনার পাশাপাশি তিনি তালিকাভুক্ত কন্ঠশিল্পী হিসেবে রেডিও ও বিটিভিতে গান গেয়েছেন। শিল্পী হওয়ার পাশাপাশি বাবার মতো সিভিল সার্ভেন্ট হওয়ার বাসনা ছিলো। তিনি বিসিএস পরীক্ষা দেয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তিনি পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে বিখ্যাত শিল্পী হতে চাইতেন। তিনি উচ্চাঙ্গ সংগীতের মধ্য দিয়ে শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে চেয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশেই নয় ভারত উপমহাদেশের শিল্পী হতে চেয়েছিলেন। প্রসঙ্গত: উল্লেখ করা যায় যে, ২০১০ সালের ২৫ ডিসেম্বর তারিখে দিল্লীর প্রখ্যাত সংগীত গুরু অখিল কুমার দাশ শিল্পকলা একাডেমীতে সংগীত পরিবেশন করেন। তিনি লোকমুখে পাওশির ভাল হিন্দী গাওয়ার কথা জানতে পারেন। তাই তিনি দিল্লী থেকে সহশিল্পী না এনে পাওশিকে দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা সংগীত পরিবেশন করান। পাউশির সংগীত দর্শক-শ্রোতা নন্দিত হয়েছিল।

তিনি সংগীতকে সমাজভিত্তিক ও কর্মসহায়ক উপাদন হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। রিহিয়ারস্যাল ও তাঁর আবাসস্থল সরকারী অফিসার্স কোয়ার্টারে হওয়ায় প্রতিবেশী শিশুদের তিনি সংগীত শেখাতেন এবং বিভিন্ন জাতীয় দিবসে অনুষ্ঠান আয়োজন করতেন। তাঁর ইচ্ছে ছিল উপার্জিত অর্থ দ্বারা প্রতিবন্ধী শিশুদের বিশেষ করে বুদ্ধি প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে ব্যয় করা এবং তাদের জন্য একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।

তাঁর জীবনের আশা অপূর্ণ অবস্থায় ৭ মে ২০১৫ তারিখে মহাপ্রয়াণ ঘটে। এ গানগুলো তার সৃষ্টিকর্ম। আশা করি এগুলোর মাধ্যমে তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন। হারিয়ে যাওয়া এ মানুষটি সম্পর্কে সকলে জানার সুযোগ পাবেন। তিনি নিজে এখানে থেকে গানগুলো পরিবেশন করতে পারলেনা। ভবিষ্যতে আরো ভাল গান নিয়ে আসার সুযোগ রইল না।

সম্পাদক

Leave a Reply