গানের পাখি পাওশি

গানের পাখি পাওশি

মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক

জন্ম-মৃত্যু দুটি পরিপূরক অনুষঙ্গ। জন্ম মাত্রই মৃত্যু অবধারিত। তদুপরি কিছু কিছু মৃত্যু মেনে নেয়া বেশ মুশকিল হয়ে পড়ে। কিছুতেই মনকে মানানো যায় না। এ ধরণের অনাকাঙ্খিত কিংবা অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর বেদনার রেশ স্বজনদের হৃদয়ে রয়ে যায় আমৃত্যু। বুকের গহীনে জগদ্দল পাথরের মত চেপে থাকে সেই সব হারাবার ভার। ২৬ এপ্রিল (১২ বৈশাখ) ১৯৮৫ সালে যার জন্ম, তাকে যদি ৭ মে, ২০১৫ সালে, মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে যেতে হয়, তাহলে তা কি করে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণীয় হয়, কি করে তা মেনে নেয়া যায়? তারপরও তা মেনে নিতে হয়। বিধির বিধান বলে সে বিপর্যয়কে বুকে ঠাঁয় দিতে হয়, দীর্ঘশ্বাসকে সংগী করে মেনে নিতে হয় এ ধরনের চলে যাওয়াকে। তার রেখে যাওয়া টুকরো স্মৃতিকে করতে হয় বেদনা নিবারণের অবলম্বন। এভাবেই এক অপ্রত্যাশিত প্রহরে স্বজনদের আদর-ভালোবাসার মায়াজাল ছিন্ন করে চলে গেছে বৈশাখী ইবনাত পাওশি। আমাদের জন্য রেখে গেছে আদর-স্নেহ-ভালোলাগার সহস্র গুচ্ছ-গুচ্ছ স্মৃতিসহ সুর-মূর্চ্ছনার এক অনবদ্য ইতিহাস-ঐতিহ্য।

একটি দীর্ঘ অধ্যবসায়ের মাধ্যমে পাওশি নিজেকে গড়ে তুলেছিল। স্রষ্টার দেয়া কন্ঠকে করতে চেয়েছিল সুর সৃষ্টির অনন্য আধার। মাত্র চার বছর বয়স থেকেই সে সংগীত চর্চার আগ্রহী হয়ে ওঠে। সে পর্যায়ে তা মা মমতাজ বেগম হয়ে ওঠেন শিশু শিল্পীর দীক্ষাগুরু। বাবা মো: নজরুল ইসলাম সরকার শিল্পের মানুষ না হয়েও হয়ে ওঠেন কন্যার প্রজ্ঞা বিকাশের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। মায়ের অনুপ্রেরণা ও বাবার প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় পাওশি সমর্পিত হয় নারায়ণগঞ্জের প্রখ্যাত ওস্তাদ আবু তাহেরের সমীপে। ১৯৯০-১১৯৫ পর্যন্ত সে তাঁর কাছে তালিম নেন। এর পর ১৯৯৬-৯৭ পর্যন্ত সে নিজেকে আরও বিকশিত করবার প্রত্যয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে সংগীত বিশেষজ্ঞ ড. হারুন অর রশীদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে। শিশুকাল থেকে সংগীত বিষয়ক প্রশিক্ষণের সাথে সে অব্যাহতভাবে যুক্ত থাকে। বাহ্যত, একজন সংগীত শিল্পীকে সারাজীবনই প্রশিক্ষণ বা চর্চার সাথে যুক্ত থাকতে হয়। নিজেকে শানিত করার জন্য সর্বদা করতে হয় আবশ্যকীয় রেওয়াজ। পাওশি সে পথেই চলেছিল। নিয়মিত প্রশিক্ষণ-রেওয়াজ থেকে কখনো সে নিজেকে বিচ্যুত করেনি। শেখার এ ধরণের ঐকান্তিক আগ্রহের অনুবৃত্তিক্রমে ১৯৯৮ সাল হতে সে আমৃত্যু সঙ্গীতজ্ঞ অনিল কুমার সাহার সান্নিধ্যে থেকে কিরানা ঘরানার উচ্চাঙ্গ সংগীতের তালিম গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে সমাপ্ত করেছে নজরুল একাডেমী পরিচালিত ৫ বৎসর মেয়াদী প্রশিক্ষণ কোর্স। ১৯৯৯ সাল থেকে নজরুল সংগীত সাধক ওস্তাদ খায়রুল আনাম শাকিলের কাছ থেকে গ্রহণ করছিল প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ।

 প্রশিক্ষণ গ্রহণের সাথে সাথে নিজেকে করেছিল বিকশিত। তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে বিটিভি ও বাংলাদেশ বেতারের সংগীত পরিবেশন করে হয়েছে প্রশংসিত। শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংগীত প্রতিযোগীতায় অংশ নিয়ে হয়েছে প্রশংসিত ও পুরস্কৃত। শুধু শিল্পসত্তা নয়, মানবিকতার দিক দিয়েও হয়ে উঠেছিল সংবেদনশীল ও সদগুনসম্পন্না। শিক্ষা জীবনেও রেখেছে মেধার স্বাক্ষর। অর্জন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ হতে স্নাতকোত্তর সনদ। পরবর্তী সময়ে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানসম্ভার সমৃদ্ধকরণের জন্য নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্স অব পাবলিক হেলথ ভর্তি হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে আর সেই অভীষ্ট অর্জন করতে পারেনি। অধ্যয়নরত অবস্থাকালেই তাকে চলে যেতে হয় না ফেরার দেশে। পেছনে রেখে যেতে হয় বাবা, মা, ভাই আত্মীয়-স্বজনসহ অগণিত সুহৃদকে।

পাওশি চলে গেছে। আমাদের জন্য রেখে গেছে এক রাশ বেদনার বিমূর্ত অধ্যায়। সেই সা রেখে গেছে ‌‘কত ফুল ঝরে গেছে’ শিরোনামযুক্ত ১২টি আধুনিক গানের একটি অনবদ্য এ্যালবাম। গানুগলোর সুরারোপ করেছেন এ দেশের সুব সাধকদের অন্যতম পুরোধা সঙ্গীতজ্ঞ জনাব শেখ শাদী খান। পাওশি জন্য গানুগলো লিখেছিলেন গীতিকার প্রখ্যাত নুজরুল ইসলাম বাবু, মুনশী ওয়াদূদ, আশরাফ হোসেন ও এস এম হেদায়েত। এ্যালবামটি প্রকাশ করেছে সোনালি প্রোডাক্ট, বিডি।

পাওশি যে অচিরে সবাইকে ছেড়ে চলে যাবে, গানের কথামালায় সে বার্তাই যেন অনুরণিত হয়েছে। তন্ময় হয়ে তার গান শুনতে শুনতে আচানক দুচোখের কোণে জমে ওঠে জল। গীতিকারগণ লিখেছেন: ১। আমি কি জানতাম –সে আমার পর হয়ে যাবে। ২। কত ফুল ঝরে গেছে-কতদিন কত চলে গেছে-সেতো ফিরে এলো না সে তো ফিরে এলো না। ৩। পার যদি দাও ফিরিয়ে-সেই জীবন আমার-ছিলাম যখন আমি অনেক-তোমার। ৪। ভুলেও তুমি, গানেও তুমি, প্রাণেও তুমি-তুমি ছাড়া যেন আমি আজ নেইতো আমি। ৫।আকাশ যেমন লক্ষ তারার প্রদীপ-জ্বেলে রয়এমনি তোমার ভালবাসা সত্যি যেন হয়। ৬। দেশ প্রেমিক হয় যদি দেশের মানুষ-সেই দেশ স্বর্গ হয়ে যায় (গীতিকার: মুনশী ওয়াদূদ)। ৭। হৃদয়ের চেয়ে ভাল কোন ফুলদানি নেই। ৮। কথা বলে কাজ নেই রাখ টেলিফোন-মিছে মিছে করো করো কেন এতো জ্বালাতন। ৯। নীল কাগজে লিখে দিলাম। ১০। মনের মানুষ যদি কারো-জীবন সাথী হয় তার জীবনে  কিছু কি আর পাওয়ার বাকি রয় (গীতিকার: নজরুল ইসলাম বাবু)। ১১। পথে যেতে যেতে যারে-আমি একবারই দেখেছি তার চোখে চোখে রেখে আমি কত স্বপ্ন এঁকেছি-কেন সে আমারে দিয়েছে ফিরিয়ে (গীতিকার: এস এম হেদায়েত)। ১২ ।  জানালা খুলে দেখি দাঁড়িয়ে আছ-কৃষ্ণ চূড়ার বনে (গীতিকার: আশরাফ হোসনে)।

পাওশির বাবা আমাদের সহকর্মী হলেও তাকে কখনো দেখার সুযোগ হয়নি। বেঁচে থাকলে হয়ত দেখা হত। সে আশা আজ সুদূর পরাহত। তার মা মমতাজ বেগম এখন আমাদের পরিবারের একজন হয়ে আছেন। আমার কন্যাত্রয়ের মাঝে তিনি তার প্রয়াত পাওশির প্রতিছব্বি দেখেন। তাদের জন্য প্রায়শ জামা-কাপড় কিনে দেন। আমি কম্পিত হাতে কন্যাদের জন্য দেয়া উপহারের ব্যাগ গ্রহণকালে ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ি। বেদনাহত দৃষ্টিতে দেখি একজন সন্তানহারা মায়ের অবয়ব। নিস্তব্ধ হয়ে একজন মায়ের মুখে শুনি একজন কন্যার শিল্পী হয়ে ওঠার নানামাত্রিক গল্প-কথা। তার কথা শুনতে শুনতে মনে পড়ে পাওশির গানের চরণ, যেখানে সে সুরেলা কন্ঠে গয়েছে: আমি কি জানতাম-সে আমার পর হয়ে যাবে। কিংবা কত ফুল ঝরে গেছে-কতদিন চলে গেছে –সেতো ফিরে এলো না। হ্যাঁ এরই মধ্যে অনেক ফুল ঝরে গেছে কিন্তু সে আমাদের প্রাণের পাওশি ফিরে আসেনি। ফিরে না এলেও ‌‘কত ফুল ঝরে গেছে’ এ্যালবামের মাধ্যমে পাওশি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবে অনন্তকাল। তার জন্য রইলো অনেক অনেক দোয়া। ওপারে সে গানের পাখি হয়ে উড়ে বেড়াক স্বর্গের অপার উদ্যানে।

Leave a Reply